ইদানিং জীবন যাপন

আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন,
প্রাত্যহিক সব কাজ ঠিক-ঠাক করে চলেছেন
খাচ্ছেন-দাচ্ছেন, অফিসে যাচ্ছেন,
... প্রেসক্লাবে আড্ডাও দিচ্ছেন।

মাঝে মাঝে কষ্টেরা আমার
সারাটা বিকেল বসে দেখেন মৌসুমী খেলা,
গোল স্টেডিয়াম যেন হয়ে যায় নিজেই কবিতা।

আজকাল আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই থাকেন,
অঙ্কুরোদ্‌গম প্রিয় এলোমেলো যুবকের
অতৃপ্ত মানুষের শুশ্রূষা করেন। বিরোধী দলের ভুল
মিছিলের শোভা দেখে হাসেন তুমুল,
ক্লান্তিতে গভীর রাতে ঘরহীন ঘরেও ফেরেন,
নির্জন নগরে তারা কতিপয় নাগরিক যেন
কতো কথোপকথনে কাটান বাকিটা রাত,
অবশেষে কিশোরীর বুকের মতন সাদা ভোরবেলা
অধিক ক্লান্তিতে সব ঘুমিয়ে পড়েন।

আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, মোটামুটি সুখেই আছেন।
প্রিয় দেশবাসী;
আপনারা কেমন আছেন?

আমি যদি হতাম

আমি যদি হতাম বনহংস;
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে
... ধানক্ষেতের কাছে
ছিপছিপে শরের ভিতর
এক নিরালা নীড়ে;
তাহলে আজ এই ফাল্পুনের রাতে
ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে
আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে
আকাশের রুপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম-
তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন-
নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালি ফুলের মতো অজস্র তারা,
শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ে
সোনার ডিমের মতো
ফাল্গুনের চাঁদ।
হয়তো গুলির শব্দঃ
আমাদের তির্যক গতিস্রোত,
আমাদের পাখায় পিস্‌টনের উল্লাস,
আমাদের কন্ঠে উত্তর হাওয়ার গান!
হয়তো গুলির শব্দ আবারঃ
আমাদের স্তব্ধতা,
আমাদের শান্তি।
আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না:
থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;
আমি যদি বনহংস হতাম,
বনহংসী হতে যদি তুমি;
কোনো এক দিগন্তের জলসিড়ি নদীর ধারে
ধানক্ষেতের কাছে।

দূরের পাল্লা

ছিপখান তিন-দাঁড়--
তিনজন মাল্লা
চৌপর দিন-ভোর
দ্যায় দূর-পাল্লা !

পাড়ময় ঝোপঝাড়
জঙ্গল,--জঞ্জাল,
জলময় শৈবাল
পান্নার টাঁকশাল |

কঞ্চির তীর-ঘর
ঐ-চর জাগছে,
বন-হাঁস ডিম তার
শ্যাওলায় ঢাকছে |

চুপ চুপ--ওই ডুব
দ্যায় পান্ কৌটি
দ্যায় ডুব টুপ টুপ
ঘোমটার বৌটি !

ঝকঝক কলসীর
বক্ বক্ শোন্ গো
ঘোমটার ফাঁক বয়
মন উন্মন গো |

তিন-দাঁড় ছিপখান
মন্থর যাচ্ছে,
তিনজন মাল্লায়
কোন গান গাচ্ছে ?

রূপশালি ধান বুঝি
এইদেশে সৃষ্টি,
ধুপছায়া যার শাড়ী
তার হাসি মিষ্টি |

মুখখানি মিষ্টিরে
চোখদুটি ভোমরা
ভাব-কদমের--ভরা
রূপ দেখ তোমরা !

ময়নামতীর জুটি
ওর নামই টগরী,
ওর পায়ে ঢেউ ভেঙে
জল হোলো গোখরী !

ডাক পাখী ওর লাগি'
ডাক ডেকে হদ্দ,
ওর তরে সোঁত-জলে
ফুল ফোটে পদ্ম |

ওর তরে মন্থরে
নদ হেথা চলছে,
জলপিপি ওর মৃদু
বোল বুঝি বোলছে |

দুইতীরে গ্রামগুলি
ওর জয়ই গাইছে,
গঞ্জে যে নৌকা সে
ওর মুখই চাইছে |

আটকেছে যেই ডিঙা
চাইছে সে পর্শ,
সঙ্কটে শক্তি ও
সংসারে হর্ষ |

পান বিনে ঠোঁট রাঙা
চোখ কালো ভোমরা,
রূপশালী-ধান-ভানা
রূপ দেখ তোমরা



কবি সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন ছন্দের যাদুকর। এ কবিতায় তিনি দুটো ছন্দ ব্যবহার করেছেন-
স্বরবৃত্তের হিসেবে-
ছিপখান/ তিনদাঁড়/ তিনজন/ মাল্লা
... 1+1/1+1/1+1/1+1=2+2+2+2
চৌপর/ দিনভর,/ দেয় দূর /পাল্লা
1+1/1+1/1+1/1+1=2+2+2+2
মাত্রাবৃত্তে-
ছিপখান/ তিনদাঁড়/ তিনজন/ মাল্লা
2+2/2+2/2+2/2+1=4+4+4+3
চৌপর/ দিনভর,/ দেয় দূর /পাল্লা
2+2/2+2/2+2/2+1=4+4+4+3

বীরপুরুষ

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ'ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক'রে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে
... টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।
সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে,
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।
ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,
কোনোখানে জনমানব নাই,
তুমি যেন আপন-মনে তাই
ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’
আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো,
ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে-
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,
‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’
এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’
ওই - যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে,
বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে
আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,
‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’
তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’
আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’
ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।।
এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক'রে,
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে
বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’
কী দুর্দশাই হত তা না হলে!’

অন্যরকম সংসার


এই তো আবার যুদ্ধে যাবার সময় এলো
আবার আমার যুদ্ধে খেলার সময় হলো
এবার রানা তোমায় নিয়ে আবার আমিযুদ্ধে যাবো
এবার যুদ্ধে জয়ী হলে গোলাপ বাগান তৈরী হবে
হয় তো দুজন হারিয়ে যাবো ফুরিয়ে যাবো
... তবুও আমি যুদ্ধে যাবো তবু তোমায়যুদ্ধে নেবো
অন্যরকম সংসারেতে গোলাপ বাগান তৈরী করে
হারিয়ে যাবো আমরা দুজন ফুরিয়েযাবো
স্বদেশ জুড়ে গোলাপ বাগান তৈরী করে
লাল গোলাপে রক্ত রেখে গোলাপ কাঁটায় আগুন রেখে
আমরা দুজন হয় তো রানা মিশেই যাবো মাটির সাথে
মাটির সথে মিশে গিয়ে জৈবসারে গাছ বাড়াবো
ফুল ফোটাবো, গোলাপ গোলাপ স্বদেশ হবে
তোমার আমার জৈবসারেতুমি আমি থাকবো তখন
অনেক দূরে অন্ধকারে, অন্যরকম সংসারেতে

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে


তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির
নিমন্ত্রণে,
... তখন ছিলেম বহু দূরে কিসের অন্বেষণে

কূলে যখন এলেম ফিরে
তখন অস্ত শিখর শিরে
চাইল রবি শেষ চাওয়া তার
কনকচাঁপার বনে

আমার ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন
অন্যমনে

লিখন তোমার বিনিসুতোর
শিউলিফুলের মালা,
বাণী সে তার সোনায়-ছোঁওয়া
অরুণ-আলোয় ঢালা--

এল আমার ক্লান্ত হাতে
ফুল-ঝরানো শীতের রাতে
কুহেলিকায় মন্থর
কোন মৌন সমীরণে;

তখন ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন
অন্যমনে

পাহাড় চূড়ায়


অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ
... কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না
... যদি তার দেখা পেতাম,
দামের জন্য আটকাতো না
আমার নিজস্ব একটা নদী আছে,
সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে
কে না জানে, পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশী
পাহাড় স্থানু, নদী বহমান
তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই
কিনতাম
কারণ, আমি ঠকতে চাই

নদীটাও অবশ্য কিনেছিলামি একটা দ্বীপের বদলে
ছেলেবেলায় আমার বেশ ছোট্টোখাট্টো,
ছিমছাম একটা দ্বীপ ছিল
সেখানে অসংখ্য প্রজাপতি
শৈশবে দ্বীপটি ছিল আমার বড় প্রিয়
আমার যৌবনে দ্বীপটি আমার
কাছে মাপে ছোট লাগলোপ্রবহমান ছিপছিপে তন্বী নদীটি বেশ পছন্দ হল আমার
বন্ধুরা বললো, ঐটুকু
একটা দ্বীপের বিনিময়ে এতবড়
একটা নদী পেয়েছিস?
খুব জিতেছিস তো মাইরি!
তখন জয়ের আনন্দে আমি বিহ্বল হতাম
তখন সত্যিই আমি ভালবাসতাম নদীটিকে
নদী আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিত
যেমন, বলো তো, আজ
সন্ধেবেলা বৃষ্টি হবে কিনা?
সে বলতো, আজ এখানে দক্ষিণ গরম হাওয়া
শুধু একটি ছোট্ট দ্বীপে বৃষ্টি,
সে কী প্রবল বৃষ্টি, যেন একটা উৎসব!
আমি সেই দ্বীপে আর যেতে পারি না,
সে জানতো! সবাই জানে
শৈশবে আর ফেরা যায় না

এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই
সেই পাহাড়ের পায়ের
কাছে থাকবে গহন অরণ্য, আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাব, তারপর শুধু রুক্ষ
কঠিন পাহাড়
একেবারে চূড়ায়, মাথার
খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী,
চরাচরে তীব্র নির্জনতা
আমার কন্ঠস্বর সেখানে কেউ
শুনতে পাবে না
আমি শুধু দশ দিককে উদ্দেশ্য করে বলবো,
প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি একা-
এখানে আমার কোন অহঙ্কার নেই
এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে
হে দশ দিক, আমি কোন দোষ করিনি
আমাকে ক্ষমা করো

অন্ধ মেয়ে

গভীর কালো মেঘের পরে রঙিন ধনু বাঁকা,
রঙের তুলি বুলিয়ে মেঘে খিলান যেন আঁকা!
সবুজ ঘাসে রোদের পাশে আলোর কেরামতি
রঙিন্ বেশে রঙিন্ ফুলে রঙিন্ প্রজাপতি!
অন্ধ মেয়ে দেখ্ছে না তা – নাইবা যদি দেখে-
... শীতল মিঠা বাদল হাওয়া যায় যে তারে ডেকে!
শুনছে সে যে পাখির ডাকে হরয কোলাকুলি
মিষ্ট ঘাসের গন্ধে তারও প্রাণ গিয়েছে ভুলি!
দুঃখ সুখের ছন্দে ভরা জগৎ তারও আছে,
তারও আধার জগৎখানি মধুর তারি কাছে।।

ভুল

যে যায় ভুলে
ফেরে'না সে ভুলে
রেখে যায় শুধু ভুল।
...
আমি ভুলে যাই
ভুল করে চাই
ভুল করে আনি ভুল।

ভুল করে দেখি
আয়নায় সুখ
ভুল করে দেখি
ভুলে যাওয়া মুখ
ভুলে ভুলে যাই ভুল।

যে যায় ভুলে
ফেরে'না সে ভুলে
রেখে যায় শুধু ভুল।

ইলশে গুঁড়ি

ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি
ইলিশ মাছের ডিম|
ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
দিনের বেলায় হিম|
কেয়াফুলে ঘুণ লেগেছে,
পড়তে পরাগ মিলিয়ে গেছে,
মেঘের সীমায় রোদ হেসেছে
আলতা-পাটি শিম্|
ইলশে গুঁড়ি হিমের কুঁড়ি,
রোদ্দুরে রিম্ ঝিম্|
হালকা হাওয়ায় মেঘের ছাওয়ায়
ইলশে গুঁড়ির নাচ, -
ইলশে গুঁড়ির নাচন্ দেখে
নাচছে ইলিশ মাছ|
কেউ বা নাচে জলের তলায়
ল্যাজ তুলে কেউ ডিগবাজি খায়,
নদীতে ভাই জাল নিয়ে আয়,
পুকুরে ছিপ গাছ|
উলসে ওঠে মনটা, দেখে
ইলশে গুঁড়ির নাচ|
ইলশে গুঁড়ি পরীর ঘুড়ি
কোথায় চলেছে,
ঝমরো চুলে ইলশে গুঁড়ি
মুক্তো ফলেছে!
ধানেক বনে চিংড়িগুলো
লাফিয়ে ওঠে বাড়িয়ে নুলো;
ব্যাঙ ডাকে ওই গলা ফুলো,
আকাশ গলেছে,
বাঁশের পাতায় ঝিমোয় ঝিঁঝিঁ,
বাদল চলেছে|
মেঘায় মেঘায় সূর্য্যি ডোবে
জড়িয়ে মেঘের জাল,
ঢাকলো মেঘের খুঞ্চে-পোষে
তাল-পাটালীর থাল|
লিখছে যারা তালপাতাতে
খাগের কলম বাগিয়ে হাতে
তাল বড়া দাও তাদের পাতে
টাটকা ভাজা চাল;
পাতার বাঁশী তৈরী করে'
দিও তাদের কাল|
খেজু পাতায় সবুজ টিয়ে
গড়তে পারে কে?
তালের পাতার কানাই ভেঁপু
না হয় তাদের দে|
ইলশে গুঁড়ি - জলের ফাঁকি
ঝরছে কত বলব তা কী?
ভিজতে এল বাবুই পাখী
বাইরে ঘর থেকে; -
পড়তে পাখায় লুকালো জল
ভিজলো নাকো সে|
ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি!
পরীর কানের দুল,
ইলশে গুঁড়ি! ইলশে গুঁড়ি!
ঝরো কদম ফুল|
ইলশে গুঁড়ির খুনসুড়িতে
ঝাড়ছে পাখা - টুনটুনিতে
নেবুফুলের কুঞ্জটিতে
দুলছে দোদুল দুল্;
ইলশে গুঁড়ি মেঘের খেয়াল
ঘুম-বাগানের ফুল|

এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি

এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি — আমি হৃষ্ট কবি
আমি এক; — ধুয়েছি আমার দেহ অন্ধকারে একা একা সমুদ্রের জলে;
ভালোবাসিয়াছি আমি রাঙা রোদ, ক্ষান্ত কার্তিকের মাঠে — ঘাসের আঁচলে
ফড়িঙের মতো আমি বেড়ায়েছি — দেখেছি কিশোরী এস হলুদ করবী
ছিঁড়ে নেয় — বুকে তার লাল পেড়ে ভিজে শাড়ি করুন শঙ্খের মতো ছবি
ফুটাতেছে — ভোরের আকাশখানা রাজহাস ভরে গেছে নব কোলাহলে
নব নব সূচনার: নদীর গোলাপী ঢেউ কথা বলে — তবু কথা বলে,
তবু জানি তার কথা কুয়াশায় ফুরায় না — কেউ যেন শুনিতেছে সবি

কোন্‌ রাঙা শাটিনের মেঘে বসে — অথবা শোনে না কেউ, শূণ্য কুয়াশায়
মুছে যায় সব তার; একদিন বর্ণচ্ছটা মুছে যাবো আমিও এমন;
তবু আজ সবুজ ঘাসের পরে বসে থাকি; ভালোবাসি; প্রেমের আশায়
পায়ের ধ্বনির দিকে কান পেতে থাকি চুপে; কাঁটাবহরের ফল করি আহরণ
কারে যেন এই গুলো দেবো আমি; মৃদু ঘাসে একা — একা বসে থাকা যায়
এই সব সাধ নিয়ে; যখন আসিবে ঘুম তারপর, ঘুমাব তখন।

নদী স্বপ্ন

কোথায় চলেছো? এদিকে এসো না! দুটো কথা শোনা দিকি

এই নাও- এই চকচকে ছোটো, নুতন রূপোর সিকি

ছোকানুর কাছে দুটো আনি আছে, তোমারে দেবো গো তা-ও,

আমাদের যদি তোমার সঙ্গে নৌকায় তুলে নাও।

নৌকা তোমার ঘাটে বাঁধা আছে- যাবে কি অনেক দূরে?

পায়ে পড়ি, মাঝি, সাথে নিয়ে চলো মোরে আর ছোকানুরে

আমারে চেনো না? মোর নাম খোকা, ছোকানু আমার বোন

তোমার সঙ্গে বেড়াবো আমরা মেঘনা-পদ্মা-শোন।

দিদি মোরে ডাকে গোবিন্দচাঁদ, মা ডাকে চাঁদের আলো,

মাথা খাও, মাঝি, কথা রাখো! তুমি লক্ষী, মিষ্টি, ভালো!

বাবা বলেছেন, বড় হয়ে আমি হব বাঙলার লাট,

তখন তোমাকে দিয়ে দেব মোর ছেলেবেলাকার খাট।

চুপি-চুপি বলি, ঘুমিয়ে আছে মা, দিদি গেছে ইস্কুলে,

এই ফাঁকে মোরে-আর ছোকানুরে- নৌকোয়া লও তুলে।

কোন ভয় নেই – বাবার বকুনি তোমাকে হবে না খেতে

যত দোষ সব, আমার- না, আমি একা ল’ব মাথা পেতে।

নৌকো তোমার ডুবে যাবে নাকো, মোরা বেশি ভারি নই,

কিচ্ছু জিনিস নেবো না সঙ্গে কেবল ঝন্টু বই।

চমকালে কেন! ঝন্টু পুতুল, ঝন্টু মানুষ নয়,

একা ফেলে গেলে, ছোকানুরে ভেবে কাঁদিবে নিশ্চয়।

অনেক রঙের পাল আছে, মাঝি? বাদামী? সোনালী? লাল?

সবুজও? তা হলে সেটা দাও আজ, সোনালীটা দিয়ো কাল।

সবগুলো নদী দেখাবে কিন্তু। আগে চলো পদ্মায়,

দুপুরের রোদে রূপো ঝলমল সাদা জল উছলায়

শুয়ে’ শুয়ে’ – মোরা দেখিব আকাশ- আকাশ ম-স্ত বড়,

পৃথিবীর যত নীল রঙ- সব সেখানে করেছে জড়।

মায়ের পূজোর ঘরটির মত, একটু ময়লা নাই,

আকাশেরে কে যে ধোয় বারবার, তুমি কি জানো তা ভাই?

কালো-কালো পাখি বাঁকা ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলে যায় দূরে,

উঁচু থেকে ওরা দেখিতে কি পায় মোরে আর ছোকানুরে?

রূপোর নদীতে রূপোর ইলিশ- চোখ ঝলসানো আঁশ,

ওখানে দ্যাখো না- জালে বেঁধে জেলে তুলিয়াছে একরাশ।

ওটা চর বুঝি? একটু রাখো না, এ তো ভারি সুন্দর।

এ যেন নতুন কার্পেট বোনা! এই পদ্মার চর?

ছোকানু, চল রে, চান ক’রে আসি দিয়ে সাত-শোটা ডুব,

ঝাঁপায়ে-দাপায়ে টলটলে জলে নাইতে ফুর্তি খুব।

ইলিশ কিনলে? আঃ, বেশ বে তুমি খুব ভালো, মাঝি

উনুন ধরাও ছোকানু দেখাবে রান্নার কারসাজি।

খাওয়া হ’লো শেষ- আবার চলেছি, দুলছে ছোট্ট নাও,

হাল্কা নরম হাওয়ায় তোমার লাল পাল তুলে দাও।

আমর দু’জন দেখি ব’সে ব’সে আকাশ কত না নীল,

ছোট পাখি আরো ছোট হ’য়ে যায়- আকাশের মুখে তিল

সারাদিন গোলা, সূর্য লুকালো জলের তলার ঘরে,

সোনা হ’য়ে জ্বলে পদ্মার জল কালো হ’লো তার পরে।

সন্ধ্যার বুকে তারা ফুটে ওঠে- এবার নামাও পাল

গান ধরো, মাঝি; জলের শব্দ ঝুপঝুপ দেবে তাল।

ছোকানুর চোখ ঘুমে ঢুলে আসে- আমি ঠিক জেগে আছি,

গান গাওয়া হ’লে আমায় অনেক গল্প বলবে, মাঝি?

শুনতে-শুনতে আমিও ঘুমাই বিছানা বালিশ বিনা-

মাঝি, তুমি দেখো ছোকানুরে, ভাই, ও বড়োই ভীতু কিনা

আমার জন্য কিচ্ছু ভেবো না, আমিই তো বড়োই প্রায়,

ঝড় এলে ডেকো আমারে- ছোকানু যেন সুখে ঘুম যায়।